নীড়পাতাআজকের পত্রিকাপ্রথম পাতা

অবৈধভাবে গড়ে উঠছে আশিয়ান সিটি ও শীতলছায়া





এম সাইফুল

অনুমোদন ছাড়াই গড়ে উঠছে আশিয়ান ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের ‘আশিয়ান সিটি’ প্রথম পর্ব ও ‘শীতলছায়া’ নামের দুটি আবাসিক প্রকল্প। এরই মধ্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) আশিয়ানের ওই দুটি প্রকল্পের পুরো কার্যক্রম অবৈধ ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে এসব প্রকল্পের যেকোনো ধরনের বিজ্ঞাপন প্রচারও নিষিদ্ধ করেছে রাজউক। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে আশিয়ান তাদের প্রকল্পের উন্নয়নকাজ ও বিজ্ঞাপন চালিয়ে যাচ্ছে।
গত ৮ আগস্ট ‘আশিয়ান সিটি’ আবাসিক প্রকল্পের প্রথম পর্ব ও ‘আশিয়ান শীতলছায়া’ প্রকল্পের সব কার্যক্রম এবং বিজ্ঞাপন বন্ধ করতে নোটিশ দেয় রাজউক। ওই নোটিশে বলা হয়, আবাসিক প্রকল্প দুটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত না হওয়া সত্ত্বেও মাটি ভরাট, বিভিন্ন মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন প্রচার, সাইনবোর্ড ও বিলবোর্ড স্থাপনাসহ যাবতীয় উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে, যা বেসরকারি আবাসিক প্রকল্পের ভূমি উন্নয়ন বিধিমালা ২০০৪-এর উপবিধি ১৬(৩) ও রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ধারা ৬(২) সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। রাজউকের পক্ষ থেকে নোটিশটি আশিয়ানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নজরুল ইসলাম ভূঁইয়াকে পাঠানো হয়। নোটিশের স্মারক নং ৬-৩৪৩/৫৬৬।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজউকের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও প্রকল্প দুটির কাজ চলছে। এমনকি এসব প্লট বিক্রির জন্য নিয়মিত প্রচারণাও চালানো হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় জনগণের জমি অবৈধভাবে দখল করে ভরাট করে গড়ে তোলা হচ্ছে ‘আশিয়ান শীতলছায়া’ প্রকল্পটি। এতে ক্ষতিগ্রস্তরা এরই মধ্যে রাজউক, গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
খিলক্ষেত, উত্তরখান, দক্ষিণখান ও বরুরা মৌজার ৩০০ পরিবারের প্রায় ১০০ বিঘা জমি জোর করে ভরাট করে আশিয়ান ল্যান্ড ডেভেলপমেন্টস লিমিটেড গড়ে তুলছে শীতলছায়া প্রকল্প। এ এলাকার সাধারণ নিরীহ জনগণের অনেকে তাদের ভিটে হারাতে চলেছেন। রাজউক, গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় পুলিশকে একাধিক অভিযোগ করেও কোনো সুফল পাচ্ছেন না ক্ষতিগ্রস্তরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, খিলক্ষেত, বিমানবন্দর, উত্তরখান, দক্ষিণখান, বড়ুয়া ও ডুমনি এলাকায় আশিয়ান ল্যান্ড ডেভেলপমেন্টস লিমিটেড কর্তৃপক্ষ আশিয়ান সিটি প্রকল্পের জন্য বিমানবন্দরের পার্শ্ববর্তী এসব এলাকায় অবৈধভাবে নিরীহ জনগণের নিচু জমি দখল করে আনুমানিক ৩০-৪০টি ড্রেজার দিয়ে খাল, বিল, জলাশয়, কৃষি জমি ও নিম্নাঞ্চলে বালু ভরাটের কাজ করছে।
এ প্রসঙ্গে আশিয়ান ল্যান্ড ডেভেলপমেন্টস লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) এমআই মাকসুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এসব অভিযোগ সবই মিথ্যা। যদি কারও জমি পাওনা হয়ে থাকে, আমরা তার ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেব। আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেই হবে।’ বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্রে রাজউকের নির্দেশনা অমান্যের বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি তিনি। এ ছাড়া কোম্পানির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে রাজউক বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ তাদের কাজ বন্ধ করতে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। কার জমিতে মাটি ভরাটের কাজ চলছে, জানতে চাইলে প্রকল্পের শ্রমিকরা জানান, এটি আশিয়ান ল্যান্ড ডেভেলপমেন্টস লিমিটেডের কাজ। নজরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি মাঝে মধ্যে এসে কাজ তদারক করেন বলে তারা জানান। স্থানীয়দের বলা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে এ কাজ হচ্ছে।
জমির প্রকৃত মালিকদের অভিযোগ, আশিয়ান ল্যান্ড ডেভেলপমেন্টস লিমিটেডের নিয়মিত বেতনভুক্ত সন্ত্রাসীরা এলাকায় ঘুরে ঘুরে অবৈধ দখল ও বালু ভরাটের কাজ করাচ্ছে। এ জন্য জমির প্রকৃত মালিকরা তেমন কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছেন না। রাজউক তাদের কাজ বন্ধ করার নোটিশ দিয়েই ক্ষান্ত।
এ প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলে রাজউকের সদস্য (পরিকল্পনা) শেখ আবদুল মান্নান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা তাদের কার্যক্রম অবৈধ ঘোষণা করে একটি নোটিশ দিয়েছি। এর পরও যদি তারা কাজ চালিয়ে যায়, তাদের কাছে এর জবাব চাওয়া হবে। সন্তোষজনক কোনো জবাব না পেলে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।’
চলতি বছর রাজউক ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় বরাবর ভুক্তভোগীরা একাধিক লিখিত অভিযোগ করেছেন। এ ছাড়া খিলক্ষেত ও দক্ষিণখান থানায় একাধিক সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, গত বছর থেকেই আশিয়ান ল্যান্ড ডেভেলপমেন্টস জোর করে বিভিন্ন এলাকার জমি দখল করে বালু ভরাটের কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। সারা জীবনের সঞ্চয়ের বিনিময়ে যারা ৩ কিংবা ৫ কাঠা জমি ক্রয় করেছিল, তারা আজ নিঃস্ব হওয়ার পথে। এসব মানুষের অধিকাংশ পেশায় সরকারি, আধাসরকারি, বেসরকারি কর্মকর্তা, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত কর্মচারী। এ জমিই ছিল তাদের একমাত্র সম্বল ও আশ্রয়স্থল।
মো. আলী নামের স্থানীয় এক ব্যক্তি জানান, ৩০০ পরিবারকে পথে বসিয়ে প্রায় ১০০ বিঘা জায়গায় মাটি ভরাট করছে আশিয়ান ল্যান্ড ডেভেলপমেন্টস। অন্যের জমি নিজের নাম করে বিক্রি করার জন্য ‘নাকে তেল দিয়ে ঘুমান’ শিরোনামে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে আশিয়ান। এতে ক্রেতা আকৃষ্টও হচ্ছেন। কিন্তু বিজ্ঞাপন প্রচারের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার পরও কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না রাজউক, গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কিংবা পুলিশ। তারা আশিয়ান সিটির পক্ষ নিচ্ছে— এমন অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।
অভিযোগের বিষয়ে দক্ষিণখান থানার ওসি লোকমান হেকিম জানান, আশিয়ান সিটির ভূমি দখলের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে এ পর্যন্ত তার থানায় একাধিক জিডি করেছেন ভুক্তভোগীরা। বিষয়গুলো তদন্তাধীন রয়েছে। কিছু দিন আগে আশিয়ানের কয়েকজন কর্মচারীকে পুলিশ আটক করে। এদের বিরুদ্ধে মামলা চলছে। তারা এখনো আটক আছেন।

ছবি তুলতে গিয়ে
চিত্রগ্রাহক বিপাকে

স্থানীয় জনগণের জমি অবৈধভাবে দখলের পর ভরাট করে গড়ে তোলা হচ্ছে ‘আশিয়ান শীতলছায়া’ প্রকল্প। ক্ষতিগ্রস্তরা এরই মধ্যে রাজউক, গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) প্রকল্পটির সব কার্যক্রম অবৈধ ঘোষণা করে স্থগিত রাখা ও বিজ্ঞাপন প্রচার না করতে নোটিশ দিয়েছে। কিন্তু রাজউকের আদেশ অমান্য করে আশিয়ান কর্তৃপক্ষ তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ওই অভিযোগের ভিত্তিতে রাজধানীর খিলক্ষেতের বড়ুয়া এলাকায় গতকাল রোববার আশিয়ান ‘শীতলছায়া’ প্রকল্পের ছবি তুলতে গেলে আশিয়ান ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের কর্মচারীরা ও আশিয়ানের ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা বণিক বার্তার নিজস্ব চিত্রগ্রাহক সোহেল আহমেদকে বাধা দেয়। তারা সোহেলের ক্যামেরা আটক করে এবং মোটরসাইকেল কেড়ে নেয়।

আশিয়ানের ভাড়াটে সন্ত্রাসী আনিসুর রহমান ও বাবুল সঙ্গীদের নিয়ে তার ওপর চড়াও হয়। কেন ছবি তুলেছেন— এ ব্যাপারে তারা কৈফিয়ত চায়। এক পর্যায়ে তার মোটরসাইকেল, ক্যামেরা ও ব্যাগ কেড়ে নেয়। পরে মুচলেকা দিয়ে মোটরসাইকেল ও ক্যামেরা ফিরিয়ে দিলেও ক্যামেরার মেমোরি কার্ড তারা আটকে রাখে। মেমোরি কার্ডে তাদের ছবি আছে কি না তা দেখে পরে ফিরিয়ে দেবে বলে জানায় তারা।

SOURCE: BONIK BARTA.