একই ফ্রেমে ১৯৮৬ এশিয়া কাপের তিন দল বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা

কেউ ঢাকায়, কেউ চট্টগ্রামে, কেউ নিউইয়র্কে কিংবা হিউস্টনে। ২৫ বছরের সময়ের স্রোত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিয়েছে সবাইকে। বিশ্বকাপ আর প্রাত্যহিক ব্যস্ততায় হয়তো কারও মনেই নেই, তাঁদেরই এক কীর্তির রজতজয়ন্তী নীরবে চলে গেল গত ৩১ মার্চ। ২৫ বছর আগের নায়কদের যখন মনে করিয়ে দেওয়া হলো, বাংলাদেশের প্রথম এক দিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচটাতে তো আপনিও ছিলেন—আবেগে বাষ্পরুদ্ধ হলো অনেকের কণ্ঠ, কেউ কেউ সেই প্রথম ম্যাচ খেলার মতোই রোমাঞ্চিত! বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডে দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন তারেক মাহমুদ

টাইম মেশিন বলে কি কিছু আছে?
বোধহয় আছে এবং সেটা হয়তো মানব মস্তিষ্কেই ফিট করা! ২৫ বছর আগে ফিরিয়ে নিতে সেই টাইম মেশিনের ২৫ সেকেন্ডও সময় লাগে না। বোতাম-টোতাম নেই। ‘ছু মন্তর ছু’ও বলতে হবে না। কেবল একটা প্রশ্ন করলেই হয়—১৯৮৬ এশিয়া কাপের প্রথম ম্যাচটার কথা কি মনে আছে?
থ্রটলে টান পড়ে। প্রপেলার ঘুরতে থাকে। একে একে মনে পড়ে যায় মোরাতুয়ার টাইরোন ফার্নান্ডো স্টেডিয়ামে ৪৫ ওভারের ম্যাচটার কথা। পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ...প্রতিপক্ষ ইমরান খান, ওয়াসিম আকরাম, আবদুল কাদির, মুদাসসর নজরদের পাকিস্তান...বাংলাদেশ ৯৪ রান করে ম্যাচ হেরে যায় ৭ উইকেটে... বাংলাদেশের খেলা প্রথম এক দিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচই যে ওটা!
২১ বছর ধরে দেশের বাইরে আছেন হাফিজুর রহমান সানি। টেলিফোনে ২৫ বছর আগের ম্যাচটার প্রসঙ্গ তুলতেই কণ্ঠ ধরে এল। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ। যেন টাইম মেশিনে চড়ে ফিরে গেলেন সেই দিনটিতে। তারপর এক নিঃশ্বাসে বলে গেলেন, ‘কেন মনে থাকবে না! ওই স্মৃতি জীবনেও ভুলব না। পাকিস্তান তখন দুর্দান্ত দল, ইমরান খান বিশ্বসেরা। তাদের সাথে খেলেছি। বিশাল ব্যাপার। শ্রীলঙ্কায় খেলতে গিয়ে যে সম্মান পেয়েছি ওই সম্মান জীবনে আর পাইনি...।’ হয়তো আরও কিছু বলতেন। থেমে গেলেন পরের প্রশ্ন শুনে।
 ২১ বছর দেশে আসেননি কেন?
সানি: পিছুটান নেই তাই। বাবা-মা মারা গেছেন। অন্যরা এখানেই থাকে।
পরিবারের পিছুটান না হয় নাই থাকল, দেশ কি তবু একদমই টানে না! নিউইয়র্কে বসেও কি মনে পড়ে না রকিবুল হাসান-জাহাঙ্গীর শাহ বাদশাদের কথা? পড়লেও সেটার সমাধান আছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিভাগে সুপারিনটেন্ডেন্টের চাকরিরত সাবেক এই উইকেটকিপারের কাছে, ‘রকিবুল ভাই তো আমেরিকা এলেই আমার বাসায় আসেন। ওনার সঙ্গে দেখা হয়। তা ছাড়া প্রিন্স (জি এম নওশের) এখন এখানেই থাকে। নান্নুও (মিনহাজুল আবেদীন) এলে দেখা করে। ওদের কাছে সবার খোঁজখবর পাই।’
সানি ইন্টারনেটে খোঁজখবর রাখেন বাংলাদেশের ক্রিকেটেরও। আর দেশ ছেড়ে গেলেও খেলার সঙ্গে সম্পর্কটা আছে, ‘১৯৯০ সালে বাংলাদেশ লাল ও সবুজ নামে দুটি ক্রিকেট দল করেছিলাম আমরা। এখন এখানে বাংলাদেশিদের ২০টা ক্রিকেট ক্লাব। প্রতি শনি ও রোববার খেলা হয়।’
বছর চারেক হলো যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে প্রবাস জীবন বেছে নিয়েছেন বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডে দলের পেসার জি এম নওশের প্রিন্স। ব্যবসা করেন, বাড়ি-ঘর করে স্থায়ী ঠিকানা করে নিয়েছেন সেখানেই। উৎসব অনুষ্ঠানে সানির সঙ্গে দেখা হলে স্মৃতির আয়নায় ভেসে ওঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে সেই ম্যাচ। সানিই বলছিলেন, প্রথম ম্যাচে সবার নজর কেড়েছিল প্রিন্সের বোলিং। সেটা মনে করিয়ে দিতেই নস্টালজিক দীর্ঘদেহী পেসার, ‘ম্যাচ শেষে ধারাভাষ্যকার টনি লুইস আমাদের ড্রেসিংরুমে এসেছিলেন। বললেন, গ্ল্যামরগনের হয়ে কাউন্টি খেলতে চাই কি না। উনি ওনার কার্ড দিয়ে যোগাযোগ করতে বলেছিলেন। কিন্তু আমরা তখনো ওভাবে চিন্তাই করতে শিখিনি।’
পেশাদার ক্রিকেট-জগৎ তখনো অজানাই বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের কাছে। যে কারণে মাঠে আবদুল কাদিরের সঙ্গে ইমরান খানের একটা আচরণেও ধাক্কা খেয়েছিলেন প্রিন্স, ‘আমি তখন নন স্ট্রাইকিং এন্ডে। সানি ভাই ইমরানের বলে একটা স্কয়ার কাট করলে ডিপ পয়েন্টে কাদিরের পায়ের নিচ দিয়ে বল চলে যায়। ইমরান তখন বিশ্রী ভাষায় গালি দিলে কাদির বলল, তার নাকি শরীর খারাপ। শুনে ইমরান তো আরও রেগে গেল। বলল, তাহলে আগে বললি না কেন? তোকে ড্রপ দিয়ে দিতাম। আমি শুনে থ! কাদিরের মতো এত বড় খেলোয়াড়কে কেউ এভাবে বলতে পারে!’ এই ইমরানকেই নাকি আবার ওয়াসিম আকরামের ক্ষেত্রে দেখা গেছে অন্য রকম। প্রতিটা ওভার শেষেই আকরামকে কাছে ডেকে কথা বলছিলেন অধিনায়ক। কোন বলটা ভালো হয়েছে, কোনটাতে কী সমস্যা ছিল।
প্রিন্সের বিস্ময় কেবল ইমরানের আচরণটাই। নইলে আগের বছর তারকাখচিত ওমর কোরেশী একাদশের বিপক্ষে দেশে ভালো খেলায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম বলটা করতে গিয়েও বুক কাঁপেনি প্রিন্সের, ‘সে রকম কোনো টেনশন ছিল না। শতভাগ দিয়ে খেলব, শুধু এটাই চিন্তা ছিল। সামনে কে, ভাবিনি। আত্মবিশ্বাস ছিল।’ তবে প্রথম ম্যাচ খেলার শিহরণটা অস্বীকার করলেন না, ‘ওই অভিজ্ঞতা ভোলার মতো না। আমাদের তখন কোচ ছিল না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কী জানতাম না। প্রতিটা স্টেপ নতুন মনে হচ্ছিল।’
নতুন বলে প্রিন্সের সঙ্গী সামিউর রহমানের কাছে যেমন ওই সফরে নতুন ঠেকেছিল নারকেল তেলের রান্না। ওই একটা জিনিস নাকি খুব ভুগিয়েছিল সবাইকে, ‘একদিন প্র্যাকটিস করে হোটেলে ফিরে রুম সার্ভিসে বললাম, চাপাতি আর কিমা দাও। খাবার নিয়ে বেয়ারা রুমে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে নারকেল তেলের গন্ধ এসে নাকে লাগল। সেদিন আর খেতেই পারিনি। অন্য কিছু যে খাব সে উপায়ও ছিল না। নারকেল তেল ছাড়া হোটেলের রেস্টুরেন্টে আর কোনো তেল ব্যবহার হতো না।’ পরে অবশ্য খুঁজতে খুঁজতে একটা মুসলিম হোটেল পেয়ে যান বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা, ভেজিটেবল অয়েল দিয়ে রান্না হতো সেখানে।
সেই হোটেলের কথা বলতে গিয়ে দলের অধিনায়ক গাজী আশরাফ হোসেন লিপু চলে গেলেন আরেক স্মৃতিতে, ‘এক রাতে ডিনার করে বের হওয়ার সময় দেখলাম বেশ কিছু শ্রীলঙ্কান ছেলেমেয়ে আমাদের অটোগ্রাফ নিতে দাঁড়িয়ে আছে। দেখে তো আমরা অবাক। এ ছাড়া বাংলাদেশ দল খেতে যাচ্ছে বলে হোটেল ম্যানেজমেন্টও এক্সাইটেড ছিল। মনে আছে ওই সফরে অধিনায়ক হিসেবে আলাদা সমাদর পেতাম আমি। আমরা হলিডে ইনে থাকতাম। আমার জন্য ছিল বড় সিঙ্গেল রুম।’
সামি-লিপুর হয়তো মনে নেই। খাওয়া-সমস্যার আরেকটা সমাধানও কিন্তু হয়েছিল শ্রীলঙ্কায়। তবে সেটার জন্য অপেক্ষায় থাকতে হতো সারা সপ্তাহ। ১৯৮৬-এর দলের জ্যেষ্ঠতম ক্রিকেটার রকিবুল হাসান জানালেন সেই অপেক্ষার কথা, ‘আমরা তীর্থের কাকের মতো বসে থাকতাম কবে হোটেলে মোগলাই খানা হবে। সপ্তাহে একদিন হোটেলে নারকেল তেল ছাড়া রান্না হতো। ওটাই মোগলাই খানা। এ ছাড়া বাঙালিদের কাছ থেকে জোর করে দাওয়াত নিতাম ভাত-ডাল খাওয়ার জন্য।’
মাঠের বাইরে নারকেল তেল আর মাঠে আকরাম-কাদিরের বোলিং, এশিয়া কাপে বাংলাদেশের জন্য এ দুটিকেই প্রধান সমস্যা মনে হয়েছিল পেসার সামির কাছে, ‘আকরামের মুভমেন্ট আর কাদিরের টার্নই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল মাঠে। আমি তো কাদিরের বলেই স্টাম্পড হলাম। গুগলি ছিল, বুঝতে পারিনি। ডাউন দ্য উইকেট চলে গিয়েছিলাম।’ তবে সামির আসল আফসোস একটা উইকেট পেতে পেতেও না পাওয়ায়। ইনিংসের শুরুর দিকে তাঁর বলে ক্যাচ দিয়েছিলেন পাকিস্তানি ওপেনার মহসিন খান। কিন্তু বদলি ফিল্ডার হিসেবে নামা ফারুক আহমেদ কাভারে নিতে পারলেন না ক্যাচটা।
কে জানে, হয়তো আন্তর্জাতিক ম্যাচে প্রথম মাঠে নামার রোমাঞ্চেই ক্যাচটা ফসকেছিলেন ফারুক! নিজেই বললেন, ‘বিরাট এক্সাইটমেন্টের ব্যাপার ছিল। এখন সেটা বলে বোঝাতে পারব না। পাকিস্তান বাদ দিন, নিজের দলের অনেকেই তো তখন আমার কাছে স্টার! বাদশা ভাই, রকিবুল ভাই...তাদের সাথে একসঙ্গে সফর করছি, ওটাও কম ছিল না আমার জন্য।’ অবশ্য দলের সঙ্গে থেকেও বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম ওয়ানডে খেলতে না পারার হতাশাও আছে ফারুকের, ‘আমি খেলতে চেয়েছিলাম, খেলা উচিত ছিল বলেও মনে করেছিলাম। কিন্তু নতুনদের মধ্যে কেবল নোবেল খেলেছে। ওর ফর্মও অবশ্য খুব ভালো ছিল।’ ওই ম্যাচে একাদশের বাইরে থাকা বাকি দুই ক্রিকেটার বর্তমানে জাতীয় দলের ম্যানেজার তানজীব আহসান সাদ ও সাবেক নির্বাচক ও ম্যাচ রেফারি জাহিদ রাজ্জাক মাসুম।
ফারুকের বয়স তখন ২১ কি ২২। তবে মিনহাজুল আবেদীন নান্নুই ছিলেন দলের কনিষ্ঠতম খেলোয়াড়। প্রথম ম্যাচটা তাঁর জন্যই ছিল সবচেয়ে বেশি রোমাঞ্চকর, ‘এর আগে বিদেশি ক্রিকেটারদের কথা শুনেছি, কিন্তু খেলা সেই প্রথম।’ বাবা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন বলে পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলাটা এমনিতেও অন্য রকম ব্যাপার ছিল মিনহাজুলের জন্য। তার ওপর খেললেন এক সঙ্গে দুই ভাই! চট্টগ্রামের আবেদীন কলোনির পরিবারটার জন্য সেটা ছিল উৎসবের উপলক্ষ।
সফরের মাঝে একদিন বড় ভাই নুরুল আবেদীন নোবেল ও জাহাঙ্গীর শাহ বাদশাকে নিয়ে মিয়াঁদাদের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন মিনহাজুল। ‘বড়ে মিয়া’র বলা একটা কথা এখনো মনে আছে তাঁর, ‘উনি বারবার বলছিলেন, সোজা ব্যাটে খেলবে, আর বুকে সাহস রাখবে। ক্রিকেট সাহসীদের খেলা।’ কথাটা মনে আছে নোবেলেরও, ‘মিয়াঁদাদ বলেছিলেন, বল দেখে খেল, বোলার দেখে নয়। কে বল করছে, সে চিন্তা বাদ দিয়ে উইকেটে থাকতে চেষ্টা করো।’ এই ‘সিরিয়াস’ মিয়াঁদাদই আবার মাঠে ভীষণ রসিক। হেলমেটে অনভ্যস্ত বাদশা যখন খালি মাথায় ব্যাটিং করতে নামলেন, মিয়াঁদাদ নাকি দুষ্টুমি করে বলছিলেন, ‘যো রোখেগা ওই মারেগা। মরনা হ্যায় তো মারকে মরো...।’ কথাটা এখনো মনে আছে বাদশার।
মিয়াঁদাদের সঙ্গে নোবেলের সাক্ষাৎটা প্রথম ম্যাচের আগে হলেই ভালো হতো। ইমরান-আকরামদের সামনে তাহলে অতটা কুঁকড়ে যেতে হতো না, ‘আগে সেভাবে বুঝতে পারিনি। কিন্তু খেলতে নেমে যখন দেখলাম আমার আশপাশে ইমরান-আকরামরা হাঁটাহাঁটি করছে, তখন মনে হলো—এ আমি কাদের বিপক্ষে খেলতে নামলাম! আকরামের প্রথম বলটা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক জোরে এসে থাই প্যাডে লাগল। আর ইমরানের ইনসুইং বুঝতে না পেরে তো কট বিহাইন্ডই হয়ে গেলাম।’
অনেকটা একই অভিজ্ঞতা গোলাম ফারুক সুরুর। নন স্ট্রাইকিং এন্ড থেকে এসে রফিকুল আলম পরামর্শ দিয়ে গেলেন, উইকেটে থাকলে রান আসবে। কাদিরের প্রথম বলটাও পেয়েছিলেন ফুলটস। সুরু মারলেন চার। কিন্তু পরের বলটা বুঝতেই পারেননি, ‘বলটা বাতাসে কাটল। হাত থেকে বল ডেলিভারি দেওয়ার সময় অদ্ভুত একটা শব্দ শুনলাম। সেদিন প্রথম দেখলাম একজন কোয়ালিটি বোলারের ডেলিভারি কতটা নিখুঁত হতে পারে।’
অধিনায়ক গাজী আশরাফ হোসেনের কাছে সবচেয়ে স্মরণীয় স্মৃতি হয়ে আছে ইমরান খানের সঙ্গে টস করতে যাওয়াটা, সবচেয়ে মজার স্মৃতিও, ‘টিভি ক্যামেরা ছিল না। ইমরান রোপের ভেতরে ঢুকেই বলল, “অত দূরে হেঁটে যাওয়ার দরকার কি! টসটা এখানেই সেরে ফেললে কেমন হয়?” ইমরান এই কথা বললে আমি আর কী বলব! বললাম, ঠিক আছে।’ টসের বাকি গল্পটা বললেন সুরু, ‘টসে জিতে ইমরান বোলিং নেওয়ার পর লিপু ভাই এসে বললেন, ওরা ভয় পেয়ে ফিল্ডিং নিয়েছে। কারণ ওয়ানডেতে যে কোনো কিছু ঘটতে পারে। কার সঙ্গে খেলছি ব্যাপার না, ভালো খেলতে হবে।’ একই মন্ত্র ছিল রকিবুলেরও, ‘আমাদের একটা মেসেজ ছিল—খেলাটা উপভোগ করো। এখান থেকে পজিটিভ জিনিসগুলো নাও, আইসিসি ট্রফিতে কাজে লাগবে।’
টিম ম্যানেজমেন্ট বলতে কেবল ম্যানেজার কাইয়ুম রেজা চৌধুরীই ছিলেন দলের সঙ্গে। সিনিয়র হিসেবে তাই সবাইকে চাঙ্গা রাখার কাজটা করতেন রকিবুল-বাদশা। ‘দুই ম্যাচেই হেরে গেলেও আমাদের ওরা ফাইনাল পর্যন্ত রেখেছিল সেখানে। পুরো দুই সপ্তাহ একটা পরিবারের মতো ছিলাম সবাই। ওখানে ঈদও করেছি। হাফিজুর রহমান সানির ইমামতিতে ঈদের জামাত পড়লাম এনসিসি মাঠের ইনডোরে। ১৪ দিন ছিলাম। ফাইনাল দেখে আসতে হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি জয়াবর্ধনের দেওয়া ডিনারেও গিয়েছিলাম’—২৫ বছর আগের স্মৃতি হাতড়ে জানালেন রকিবুল। তবে স্মৃতির ডানায় ভেসে শুধু সুখময় অভিজ্ঞতাই আসে না, আসে আফসোসও, ‘স্বপ্ন ছিল কপিল দেবের বল খেলব। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে ভারত এল না। ওটাই আফসোস।’
ভারত আসেনি মূলত নিরাপত্তার কারণে। অথচ ওই সফরেই বাংলাদেশ ঘুরে বেড়িয়েছে স্বাধীনভাবে, কোনো নিরাপত্তা প্রহরা ছাড়াই! ম্যানেজার কাইয়ুম রেজা চৌধুরীর কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছিল সেটাই, ‘পাকিস্তান দলকে সব সময় নিরাপত্তাকর্মীরা ঘিরে থাকত। অথচ আমরা সব খানে স্বাধীনভাবে যাতায়াত করেছি। শ্রীলঙ্কার মানুষদের সঙ্গে মিশেছি।’
তবে রকিবুলের মতো টুকটাক আফসোস আরও অনেকেরই আছে। লিপু যেমন আফসোস করেন, ‘লোভনীয় হাফভলি মনে করে আকরামকে ড্রাইভ করতে গেলাম। বলটা ছিল টিপিক্যাল ইনসুইঙ্গার। বোল্ড হয়ে গেলাম।’ তবে প্রশংসা করলেন বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ স্কোরার শহীদুর রহমান ও সবচেয়ে বেশি উইকেট পাওয়া বোলার বাদশার, ‘শহীদ কাট-পুল ভালো খেলত। ও ম্যাচটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছিল। পাল্টা আক্রমণ করে ভালো কিছু শট খেলেছিল। আর বাদশা ভাই বরাবরই ঘরোয়া ক্রিকেটের চেয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচে ভালো খেলতেন। ওই ম্যাচেও খুব ভালো বোলিং করেছিলেন।’
নিজের ব্যাটিং নিয়ে আফসোস থেকে গেলেও বল হাতে সেটা ভোলার মতো অর্জন ছিল লিপুর—মিয়াঁদাদের উইকেটটাই যে পেয়ে গিয়েছিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক! লিপু অবশ্য এ ব্যাপারে যথেষ্টই বিনয়ী, ‘জাভেদ মিয়াঁদাদের উইকেট পেয়ে খুব মজা লেগেছিল। যদিও আমি ওটাকে বেশি বড় করে দেখি না। ঢাকার বাইরে গেলে আমরাও অনেক সময় অখ্যাত বোলারের বলে আউট হয়ে যেতাম। ওটাকে ওভাবেই নিয়েছি।’
অলআউট না হয়ে পুরো ওভার খেলে আসা—আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রথম ম্যাচের এই লক্ষ্যটা অনেক দিনই অপরিবর্তিত ছিল বাংলাদেশের। সেখান থেকে হাঁটি হাঁটি পা পা করে ক্রিকেট চলে এসেছে আজকের জায়গায়। ৪৫০ রুপি দৈনিক ভাতা হয়ে গেছে ৫০ ডলার। খেলার মধ্যে ঢুকে গেছে ব্যবসা-বাণিজ্য, স্পনসর আরও কত কী! কিন্তু শুরুটা যাঁরা করে দিয়েছিলেন, এ দেশের ক্রিকেটে তাঁরা আজও নায়ক। নায়কদের বয়স যে কখনো বাড়ে না!

স্কোরকার্ড
জন প্লেয়ার গোল্ড লিফ ট্রফি (এশিয়া কাপ)
তারিখ: ৩১ মার্চ, ১৯৮৬
ভেন্যু: টাইরোন ফার্নান্ডো স্টেডিয়াম, মোরাতুয়া, শ্রীলঙ্কা।
(৪৫ ওভারের ম্যাচ)
টস: পাকিস্তান
বাংলাদেশ রান বল
রকিবুল হাসান ক জুলকারনাইন ব জাকির ৫ ১৪
নুরুল আবেদীন ক জুলকারনাইন ব ইমরান ০ ৩
গাজী আশরাফ ব আকরাম ০ ৩
শহীদুর রহমান ক ও ব কাদির ৩৭ ৬০
মিনহাজুল আবেদীন ক মনজুর ব আকরাম ৬ ২৩
রফিকুল আলম ক রমিজ ব আকরাম ১৪ ৪৩
গোলাম ফারুক ক জুলকারনাইন ব কাদির ১৪ ২৯
জাহাঙ্গীর শাহ ব আকরাম ০ ১০
হাফিজুর রহমান ব ইমরান ৮ ২৪
জি এম নওশের অপরাজিত ১ ৩
সামীউর রহমান স্টা. জুলকারনাইন ব কাদির ০ ২
অতিরিক্ত (লেবা ৪, ও ৪, নো ১) ৯
মোট (৩৫.৩ ওভারে, অলআউট) ৯৪
* এ ছাড়া বাংলাদেশ স্কোয়াডে ছিলেন: ফারুক আহমেদ, তানজীব আহসান ও জাহিদ রাজ্জাক।
উইকেট পতন: ১-৩ (নুরুল আবেদীন), ২-৪ (গাজী আশরাফ), ৩-১৫ (রকিবুল হাসান), ৪-২৭ (মিনহাজুল আবেদীন), ৫-৬৮ (রফিকুল আলম), ৬-৭০ (শহীদুর রহমান), ৭-৭৯ (জাহাঙ্গীর শাহ), ৮-৯৩ (গোলাম ফারুক), ৯-৯৩ (হাফিজুর রহমান)।
বোলিং: ইমরান খান ৭-৩-১১-২, ওয়াসিম আকরাম ৯-২-১৯-৪, জাকির খান ৭-০-২৭-১, মনজুর এলাহী ৫-১-১৮-০, আবদুল কাদির ৭.৩-১-১৫-৩।
পাকিস্তান
মুদাসসর নজর অপরাজিত ৪৭ ৯৭
মহসিন খান এলবিডব্লু ব জাহাঙ্গীর শাহ ২৮ ৪৪
রমিজ রাজা এলবিডব্লু ব জাহাঙ্গীর শাহ ০ ৮
জাভেদ মিয়াঁদাদ ক হাফিজুর ব গাজী আশরাফ ১৫ ৩২
কাসিম উমর অপরাজিত ৩ ১২
অতিরিক্ত (লেবা ৪, ও ১) ৫
মোট (৩২.১ ওভারে, ৩ উইকেটে) ৯৮
ব্যাট করেননি: মনজুর এলাহী, ইমরান খান, আবদুল কাদির, ওয়াসিম আকরাম, জুলকারনাইন, জাকির খান।
উইকেট পতন: ১-৪৫ (মহসিন খান), ২-৫৫ (রমিজ রাজা), ৩-৮৫ (জাভেদ মিয়াঁদাদ)।
বোলিং: জি এম নওশের ৭-১-৩২-০, সামীউর রহমান ৭-১-১৫-০, গোলাম ফারুক ৬-০-১৩-০, জাহাঙ্গীর শাহ ৯-১-২৩-২, গাজী আশরাফ ৩-০-৭-১, রকিবুল হাসান ০.১-০-৪-০।
ফল: পাকিস্তান ৭ উইকেটে জয়ী।
ম্যান অব দ্য ম্যাচ: ওয়াসিম আকরাম।
আম্পায়ার: হার্বি ফেলসিঙ্গার (শ্রীলঙ্কা), পিয়াদাসা ভিদানাগামাগে (শ্রীলঙ্কা)।






ব্যাটে বলে সেরা


শহীদুর রহমান ৬০ বলে ৩৭ রান, জাহাঙ্গীর শাহ ৯-১-২৩-২


ভয় দূর করেছিল চেস্ট গার্ড
জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নেমেছি। একদিক থেকে ইমরান খান, আরেক দিকে ওয়াসিম আকরাম। এর আগে তাদের কথা রেডিওতে শুনেছি, ম্যাগাজিনে ছবি দেখেছি। সামনাসামনি সেই প্রথম। রোমাঞ্চ-ভয় সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।
তবে মনে আছে, আমি ওয়াসিম আকরামের প্রথম বলটা খেলেছি ভয়ডর ছাড়াই। ঘরোয়া ক্রিকেটে তখন আবাহনীতে খেলি, আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যান হিসেবে খ্যাতি আছে। ওই ম্যাচেও উইকেটে নেমে বোলার দেখলাম না, শুধু দেখলাম বল। ৩৭ রান করে আবদুল কাদিরের বলে কট অ্যান্ড বোল্ড হয়ে গেলেও যেভাবে খেলছিলাম, তাতে ফিফটি করে ফেলা অসম্ভব ছিল না। কয়টা চার মেরেছি এখন আর মনে নেই, তবে মনে আছে, আউটফিল্ড স্লো থাকায় কয়েকটা নিশ্চিত বাউন্ডারি আগেই থেমে গিয়েছিল।
প্রথম ম্যাচেই আমার অতটা সাহসী হয়ে ওঠার কারণ ছিল একটা চেস্ট গার্ড। থাই গার্ড, হেলমেট আমাদের ছিল। কিন্তু চেস্ট গার্ড ছিল না। শ্রীলঙ্কায় গিয়ে যখন বুঝলাম উইকেট বাউন্সি হতে পারে, ওখান থেকেই একটা চেস্ট গার্ড কিনে নিলাম। এরপর আর চিন্তা কী! বুকে ওটা পরার পর সাহস কয়েক গুণ বেড়ে গেল।
দলের পক্ষে সবচেয়ে বেশি রান করা ব্যাটসম্যান আমি, প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচে এর চেয়ে বড় অর্জন বোধ হয় আর হতে পারত না আমার জন্য।

অন সাইডে দুজন ফিল্ডার রেখেছিলাম
ডিপ স্কয়ার লেগ আর শর্ট মিড অন—অন সাইডে এ ছাড়া আর ফিল্ডারই রাখিনি আমি। ওরা ভেবেছিল বল বাইরে যাবে, কিন্তু আমি দেওয়া শুরু করলাম ইনসুইং! আর তাতেই দুই দুইটা এলবিডব্লু। অবশ্য তিনটা উইকেটই পেতে পারতাম আমি। কিন্তু সানি (হাফিজুর রহমান) মুদাসসর নজরের ক্যাচটা ফেলে দিল!
সেটা নিয়ে আফসোস নেই। আমি তো আর বোলিং খারাপ করিনি! পরদিন শ্রীলঙ্কার পত্রপত্রিকায়ও দেখলাম আমার সাহসী বোলিংয়ের প্রশংসা করা হয়েছে।
শ্রীলঙ্কায় যাওয়ার আগে পাকিস্তানে গিয়ে তাদের প্রাদেশিক দলগুলোর সঙ্গে কয়েকটা ম্যাচ খেলেছিলাম আমরা। এর আগে ওমর কোরেশীর দল এসেছিল ঢাকায়। পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা তাই কিছুটা হলেও চেনা ছিল। আর আমি বল করার সময় কখনোই ভাবতাম না কাকে বল করছি। কাজেই সামনে মুদাসসর-মিয়াঁদাদ যে-ই এসেছে, আমি সাহস হারাইনি।
আমরা তখন ক্রিকেট খেলতাম সম্মানের জন্য। বাংলাদেশের ক্রিকেট যে একদিন এত ওপরে উঠবে, ওই সময় সেটা ভাবিইনি। খেলা থেকে চাওয়া-পাওয়ার তেমন কিছু ছিল না। প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে গিয়েও মাথায় ছিল কেবল দেশের সম্মানের চিন্তা। নতুন একটা দেশে খেলতে গিয়েছি। সেই দেশের মানুষ, ক্রিকেট বোর্ড, খেলোয়াড়েরা আমাদের সম্মান করবে—এটাই কেবল চাওয়া ছিল। প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম, ক্রিকেটটা আমরা খেলতে জানি। সেটা কিছুটা হলেও করতে পেরেছি ৮৬-এর এশিয়া কাপে। শ্রীলঙ্কার মানুষের শ্রদ্ধা-ভালোবাসা তো পেয়েছিই।
তার পরও প্রথম সফরে একটা আফসোস থেকে গিয়েছিল আমাদের। খুব আশা ছিল ভারতের বিপক্ষে খেলব। নিরাপত্তার কারণে শেষ পর্যন্ত ভারত এশিয়া কাপ খেলতে শ্রীলঙ্কায় গেল না। আমাদের আশাও পূরণ হলো না।